মিথ্যে ভাঙার ভাষা**

নবারুণ ভট্টাচার্য

মুখ ও মুখোশ শীর্ষক এ আলোচনার পরিসর বিস্তৃত। তাই এ বিষয়টি আলোচনার সূচনা করা হোক আমাদের আপন সমাজ থেকেই। উনিশ শতকের বাবু সংস্কৃতি থেকে হালফিলের বাঙালি সমাজ। এ সমাজের মুখোশের প্রতি আনুগত্য সীমাহীন। যে মুখোশকে ছিঁড়তে আমার ফ্যাতাড়ুরা ঘুরে বেড়ায় এ শহর, এ রাজ্যের গোটা আকাশে।

কী লিখি, কেন লিখি?
যেকোনো সাহিত্যিকৠর কাজই হল পুরোটা expose করা, innate গণ্ডগোল, লুকিয়ে থাকা সত্যের অবয়বটাকে সদৃশ করে তোলা। আর সবটাই আমি করি একটা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আমি আপামরই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ঠ। যাঁর মধ্যে প্রত্যক্ষ রাজনীতি কোনও দিনই ছিল না, নেই; অথচ সেই আমি â€˜à¦®à¦¾à¦¨à§à¦·à¦Ÿà¦¾â€™à ‡ রাজনীতি বাদ দিয়ে বড় অনুন্নত। আর লেখাটা আমার politics-এর extension, এমনকী আমার অস্তিত্বেঠ° প্রকাশও বটে। সমাজের প্রতি আমার অনুভূতি, তথাকথিত প্রচলিত মধ্যবিত্ত সমাজের থেকে একদমই বিরূপ। তাকে গ্রহণ না করেই আমি লিখছি, লিখব। শুধু লেখার বিষয়বস্তু নয়; তার গঠন, শৈলী, ভাষা, লেখার আদর্শ পুরোটাতেই তার ছাপ ফেলে যায়। আর বাঙালী সমাজ একটা এলিয়েনেশন-à à¦° শিকার। আজ কালচারাল স্টল ওয়ার্ট বলতে একটা refined mediocrity-কে বোঝায়। পুরোটা এতোটাই সাংঘাতিক পর্যায়ে গেছে যে বাঙালি নতুন করে ভাবতে পারছে না। কেন বা তার কারণ বিশ্লেষণী ক্ষমতা অবশ্য আমার সহজাত নয়। বাঙালী খুব স্থিতাবস্থ া ভালোবাসে। ত্রিশোর্ধ বছরের স্থিতাবস্থ া মানুষ ভাঙলেও পুরো কর্মকাণ্ডৠ‡à¦° ফল কিন্তু ‘পুনঃ মুষিক ভব’। পঁয়ত্রিশ বছরের এই অচলায়তন ভেঙে কী হল সেটাও অবশ্য যথেষ্ট চিন্তাযোগৠà¦¯à¥¤ বিনায়ক সেন ছাড়া পাওয়ার পর একটি সভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্ঠবাসীও সদ্য কারাগারের লৌহ কপাটকে তুচ্ছ করেছে। তবে সেই মুক্তির সাময়িকতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল আমার আর সেই সন্দেহকে সত্যি প্রমাণিত করেই সেই সাময়িক স্থিতাবস্থ ার প্রত্যাবর্ তন— ফলাফল আমরা গাড্ডায়! অবশ্য এগুলোকে আমি খুব একটা পাত্তা দিই না। ইতিহাসে অনেক কিছু ঘটে আবার ধুয়ে মুছে যায়। খুব বেশি পাত্তা এদের যেমন প্রাপ্য নয় আর ওদের ফ্যাসিস্ট Demagogy-র পরিণতি সুখকর নয়।

মুখোশহীন চরিত্রের সন্ধানে
‘আগুনমুখো €™â€“র যে ছেলেটা আগুন ছুঁড়তে ছুঁড়তে ক্লান্ত হয়ে বমি করে, মিছিল তাকে ফেলে চলে যায়। তবু সে সেই মিছিলে আবার ফিরতে চায়। বস্তুত, একটা বড়ো জনযাত্রা কখনই থেমে থাকতে পারে না, যে অসুস্থ হয় তাকেই সাময়িকভাবৠসরে যেতে হয়। কিন্তু তার মিছিলে ফিরে যাওয়ার প্রয়াস কিন্তু থেকেই যায়— সেটা কাম্য। তবে সে মিছিল কিন্তু মুখোশ নয়, ছোট্ট ছোট্ট ঘটনা, ফুটে ওঠা একাকী চরিত্রগুলঠআমার জীবনের রাস্তা থেকেই কুড়ানো নুড়ি। যা কিছু ঘটে তার à¦…à¦‚à¦¶à¦—à§à¦°à¦¹à¦£à§‡à ¦‡ লেখাগুলোক §‡ খুঁজি, লেখার ধান্দা নিয়ে আমি reality-তে যাই না, কারণ এ reality-ই আমাকে সব কিছু দিয়েছে। আর তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রয়াসই হল আমার লেখা। ফ্যাতাড়ুরা কোনও সুচিন্তিত পরিকল্পনাঠফসল নয়। অবচেতন মনের কোণে তাদের জন্ম, আবার অবসরের চিন্তায় তাদের শৈশব, কৈশোর আমি কখনও না লিখলেও, মাথার মধ্যে চরিত্রগুলৠথাবা বসায়। এভাবেই চিন্তাগুলৠসঠিক সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের পরিপূর্ণ করে তোলে।

সাদা মুখোশ
মুখোশ সম্বন্ধে বলতে পারি, পুরো ব্যাপারটাঠহল প্রয়োজনীয়ঠ¤à¦¾, অর্থাৎ কী কারণে মুখোশটা পরবে? একজন ক্রান্তিকঠ¾à¦°à§€ পরবে মুখোশ, তার মুখোশটাই তখন অবস্থার কথা বলবে, সেই উদ্দেশ্য কিন্তু স্বাগত। এই মুখোশই আবার হতে পারে মুখের পরিবর্ত। এক মানুষের হাজার সত্তা তো থাকতেই পারে। যেমন লেখক পরিচিতি নিয়ে আমি রাস্তায় বেরোতে পারিনা, আমার চরিত্রগুলৠখুঁজে পাওয়ার তাগিদটা তখন বড় হয়ে ওঠে বলে। নানাভাবে নানাস্থানৠমিশতে হয় বলেই কিন্তু আমার হাজারটা মুখোশ নেই। আমি সচেতনতাকে সঙ্গী বাছলে মুখোশ তখন অবাঞ্ছিত। ক্ষতিকর মুখোশ ভাঙায় আমি বিশ্বাসী আর নিরামিষ মুখোশ অনেকাংশেই মিশে যায় মুখের সঙ্গে— সে মিশে যাক। যেমন বলতে পারি সন্তানের সামনে রাশভারি সাজা কিন্তু নিন্দনীয় মুখোশের বিজ্ঞাপন নয়। মুখোশের মোদ্দা কথাটাই হল প্রয়োজন পূরণে তার আগমন হলেও পরবর্তী ক্ষেত্রে তার ঔচিত্য হল প্রকৃতপক্ঠ·à§‡ নান্দনিক অনুভূতির প্রকাশ মাত্র। ইতালিতে একটি প্রেমের উৎসবই হয় মাস্ক নিয়ে— ভেনেসিয়ান মাস্ক— হয় à¦®à§‡à¦•à§à¦¸à¦¿à¦•à§‹à¦¤à §‡à¦“। এগুলোর প্রত্যেকটঠ¾à¦‡ একটা সামাজিক বার্তা বহন করে।

কালো মুখোশ
মধ্যবিত্ত সমাজ এক অদ্ভুত hypocrisy-তে আক্রান্ত। যে যা নয় তা দেখাতে— আর যা সে নিজে তা দেখতে চায় না। এই hypocrisy-র জালে সে ছটফট করে। এর আদর্শ উদাহরণ যে বাঙালি বুদ্ধিজীবঠতা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের মুখে বসে গেছে শঠতা, আড়ালে রাখতে চাওয়া মুখোশগুলো⠀” That has got to be combated। রাজনৈতিক সুযোগসন্ধঠ¾à¦¨à§€ ও মিথ্যাচারৠর মুখোশ কিন্তু ভয়ঙ্কর। অথবা উন্নততর মানবিকতা ‘দেখানোর’ প্রয়াসের অন্তরালে গর্জে ওঠা কালোবাজারঠ¿ ব্যক্তিত্ঠই প্রকৃত মুখোশ। যা কিছু দৃশ্যমান, যেমন ভারতীয় গণতন্ত্র এক বৃহৎ মুখোশ। ‘দেশ’, ‘হাসপাতাল†™ উদ্দেশ্য বিচ্যুত আজ, তারাও মুখোশ। সত্তরের আন্দোলন ছিল এমনই এক মুখোশ ভাঙার খেলা, যা কিন্তু বাহ্যিক ভাবে ব্যর্থ হলেও প্রকৃতপক্ঠ·à§‡ ব্যর্থ নয়। যে কোনও আন্দোলন কালের নিয়মে নিঃশব্দ হয়, গভীরে চলে যায়, আর্টের্জিৠŸ জলের মতো ফিরে আসে আবার। আমি অপরাজেয় সংগ্রামে বিশ্বাসী। তারই প্রেক্ষিতৠ‡ বলতে পারি কোনও আন্দোলনই ব্যর্থ হয় না। সত্তরের আন্দোলনের সাফল্য এটাই যে সেই সময় সমগ্র রাজ্যের নজর এনে দিল কৃষক ও তাদের জমির ওপর। প্রথম বামফ্রন্ট সরকার দিল গরিব চাষিকে জমির পাট্টা। ভাগচাষী, খেত-à¦¶à§à¦°à¦®à¦¿à¦•à ¦°à¦¾ পেল আইনি জমির মালিকানার স্বাদ। তবে মুখ পাল্টায়, নাহলে কমিউনিস্টঠ¦à§‡à¦° মধ্যে ফুটে উঠলো কংগ্রেসি কালচার! তবে বাঙালিরও কিছু চারিত্রিক দোষ ছিলো, যার মধ্যে একটি হল বাবু কালচার। যার দ্বারা প্রভাবিত ওই ধূতি-পাঞ্জঠ¾à¦¬à¦¿ পরা মুখ্যমন্তৠরীগণ যাদের কার্যকলাপ কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তার নজির মিলল সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাঠ®à§‡à¥¤ আর তার সুযোগ নিয়ে যারা ক্ষমতায় এল তারা আরও বেশি খারাপ। যেমন আমি মনে করি, আজকে যদি ওই বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে সে আগের রূপ কখনোই ধারণ করতে পারে না। ইতিহাস সহবত শেখায়, চাগায়।

মুখোশ সমাজে গরিবেরা
এই প্রসঙ্গে বলি, জীবনের বেশিরভাগটঠ¾à¦‡ ট্র্যাজিকॠআনন্দের মুহুর্ত জীবনে হাতে গোনা, ট্র্যাজেডঠটাকেই ধারাবাহিকঠাবে বহন করে যেতে হয়। আর গরিব মানুষ তো দুঃখের সলিলেই সমাধিস্থ থাকে। অবশ্য তারা সেটাকে পাত্তা দেয় না, আর পাত্তা দিলেও তো তাদের জীবন সমস্যামুকৠত হবে না। দৈনন্দিন প্রাত্যহিঠবঞ্চনা স্বীকার করে যে ছেলেটা জিন্‌স পরে রিকশা চালায় সে তার জিন্সের ব্র্যান্ড না থাকা সত্বেও কিন্তু খুশি। তাদের কথা বলতেই আবির্ভাব ফ্যাতাড়ুদৠর, যারা প্রকৃতপক্ঠ·à§‡ অজ্ঞাত পরিচয় জনমিছিল, তারা শ্রমজীবি হতে পারে বা কৃষক। তাদের এই মুখোশহীন সংগ্রাম কিন্তু চলবেই। তবে যে গরিব সিপিএম বিনা কারণে প্রাণ হারাচ্ছে à¦®à¦¾à¦“à¦¬à¦¾à¦¦à§€à¦¦à§‡à ° হাতে, তাদের কোন দোষ নেই। তারা তো à¦®à¦¾à¦“à¦¬à¦¾à¦¦à§€à¦¦à§‡à ° শ্রেণীশত্ঠ°à§à¦“ নয়। তারা কী? শুধুমাত্র বঞ্চনার শিকার, যা তাদের ললাটে লিখন হয়েছে বুর্জোয়া politics-এর দেশে।
মুখোশের জন্ম, মুখোশের পরিবার— সাধারণ মানুষের শৈশবেই তাকে মুখোশ পরিয়ে দেওয়া হয়। সে তার অভিভাবককে মিথ্যাচারৠহতে না দেখলে, সে কখনোই মিথ্যা বলবে না। পরোপকারী অভিভাবকের সন্তান কখোনই গড়ে তোলে না স্বার্থমুঠর খাদক সমাজ। ভোগবাদ এ সমাজের এক বড়ো কলঙ্ক। ভোগের পিছনে দৌড়ানো ছেলেটি কখন যে নিজেই হয়ে ওঠে ভুক্ত, সে বুঝতেও পারেনা। Consumer world-এর এটাই মূল উপজীব্য যে সেই à¦¸à¦‚à¦¸à§à¦•à§ƒà¦¤à¦¿à¦•à ‡ সে খাদ্য হিসাবে বেছে নেয়। Consumer world-এর মুখোশের গভীরতা অনেক বেশি। তা কামড়ে বসে এই সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি অঙ্গে।

Masked Media, Masked Literature
কয়েক বছর আগে ভারত, কিউবা সহ কয়েকটি দেশ মিলে Non-align news pool তৈরী করেছিল। যার প্রতিকী উদ্দেশ্যই হল, ক্যালিফোরৠà¦¨à¦¿à§Ÿà¦¾à¦° একটি Night club-এ চারজন Bar-girl-এর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার থেকে কোনও বন্যায় মৃত চল্লিশ হাজারের খবরের তাৎপর্য বা ওজন অনেক বেশি। মিথ্যারূপ তুলে ধরে নিজ স্বার্থ্যা চারণকারী গণমাধ্যমই তো আসলে মুখোশ। Political calculation করে যারা কাউকে ফেলে, কাউকে তোলে, হাওয়া তৈরী করে, শ্বাসরূদ্ঠও করে। আর এই অসংখ্য মুখোশের দাবিতে, আক্রমণে মানুষ আজ ঘুরপাক খাচ্ছে, টেলিভিশন শো-তে বসা কয়েকটা নির্দিষ্ট ‘কুমিরের ছানা’ নির্দিষ্ট ওপিনিয়ন তৈরী করছে। এরা কারা? কেন আমি এদের কথা শুনব? আমার তো নিজস্ব মস্তিষ্ক আছে, আমি নিজে বিচার করব। অথচ মানুষ শুনছেও এইসব পূর্বনির্ঠারিত কর্মকাণ্ডॠ¤
মুখোশের সাহিত্যও খুব শক্তিশালী, তবে আমি সেগুলো পড়িনা, এগুলো just nonsense। যারা তাদের লেখার সম্ভার নিয়ে আসছে তাদের অনেকেই কিন্তু মুখোশহীন, ইদানীং দেখছি market-টাই প্রধান; যদিও বিভুতিভূষঠ, মানিক বন্দ্যোপাঠ্যায়র কাছে ছিল সাহিত্যি তপস্যা, আর যদি মানুষ সেই nonsense লেখা পড়ে, পড়ুক; আমি তাদের সর্বদা গুরুত্ব দিয়ে চলার মানুষও নই। ওদের প্রতি আমার কোনও বিশেষ দায় না রেখেই বলছি আমি নিজ মর্জির মালিক।

গান্ধী, বুদ্ধ ও ইতিহাস
ধর্মপ্রবর্ তকদের মুখোশ নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। মতান্তরে, গান্ধীজিরঠ“ নাকি মুখোশ ছিল। তবে তাদের মুখোশহীন কার্যকলাপঠ‡ আমায় আকৃষ্ট করে। They are great human symbols। তাদের ইতিহাস থেকে অনেক কিছুই শিক্ষণীয়। আর ইতিহাস— সে বড়ো নির্মম; কালের নিয়মে সে ছুড়ে ফেলে দেয় à¦…à¦ªà§à¦°à¦•à§ƒà¦¤à¦¦à§‡à °à¥¤ আর সেই ইতিহাসই আমার বড় প্রিয়। আটষট্টির ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় সৈনিক হয়ে বলতে পারি যে আমি সেই ইতিহাসের ঘ্রাণ নিয়েই বেঁচে আছি। এ ইতিহাস আমায় বড়ই ভাবায়, আবার এ ইতিহাসই শতশত মুখোশের অন্তিম চিতার আগুন, সে আগুনের সাক্ষী।

আদর্শ সমাজ ও মুখোশ
আমরা সবাই আদর্শ সমাজকে ছুঁতে চাই। যদিও তার বাস্তবতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। মানুষ আদর্শ সমাজ গড়তে কিঞ্চিৎ হলেও অসফল হবে। তবুও আশাবাদী যে সমাজ হবে মুখোশহীন আর সেই অভিযান নিয়েই আবার ফিরে আসবে ফ্যাতাড়ুরা , উড়ে বেড়াবে মুখশহীন সমাজের বুকে। আর এবার তারা প্রবেশ করবে high thinking world দিয়েই।
অপেক্ষায় থাকুন।
** ঐহিক সাহিত্য পত্রিকার ২০১৩ বইমেলা সংখ্যা “মুখ ও মুখোশ”-এ ‘কথনের আয়না’ বিভাগে প্রকাশিত। অনুলিখন: শৌনক চ্যাটার্জৠ।